ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন নিয়ম
ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন নিয়ম জানতে চাইলে আপনি একদম
সঠিক জায়গায় এসেছেন। অনেকেই ভাবেন এটি শুধু বিজ্ঞানীদের কাজ, কিন্তু পুরো
প্রক্রিয়াটি সহজভাবে বুঝলে বিষয়টি আর কঠিন লাগে না। চলুন ধাপে ধাপে পক্রিয়াগুলো
জেনে নেওয়া যাক।
কৃষক, শিক্ষার্থী কিংবা কৃষিপ্রেমী-যেই হোন না কেন, এই তথ্যগুলো আপনার কাজে লাগবে
এবং অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর মিলবে। শেষ পর্যন্ত পড়লে টিস্যু কালচার প্রযুক্তি
নিয়ে থাকা সাধারণ ভুল ধারণাগুলোও পরিষ্কার হয়ে যাবে, আর সিদ্ধান্ত নেওয়াও হবে
অনেক সহজ।
পোস্ট সূচিপত্রঃ ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন নিয়ম
- ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন নিয়ম
- টিস্যু কালচার কী এবং কেন এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়
- টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে কোন কোন গাছের চারা উৎপাদন করা যায়
- টিস্যু কালচারের জন্য ল্যাবরেটরিতে কী কী সরঞ্জাম লাগে
- চারা উৎপাদনের ধাপগুলো সহজ ভাষায় জানুন
- টিস্যু কালচার পদ্ধতির প্রধান সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
- ল্যাবরেটরিতে জীবাণুমুক্ত পরিবেশ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
- টিস্যু কালচারের চারা সংরক্ষণ ও রোপণ
- বাংলাদেশে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির বর্তমান ব্যবহার ও সম্ভাবনা
- শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন নিয়ম
ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন নিয়ম জানতে চাইলে প্রথমেই
বুঝে নিতে হবে, এটা আসলে কোনো ম্যাজিক না এটা একটা ধৈর্যের খেলা। গাছের একটা
ছোট্ট অংশ নিয়ে, একদম জীবাণুমুক্ত পরিবেশে, সেই অংশ থেকে হাজার হাজার নতুন চারা
বানানোর এই কৌশলটা শুনতে যতটা কঠিন লাগে, বুঝে নিলে ততটাও কঠিন না। আপনি যদি কৃষি
নিয়ে কাজ করেন বা নার্সারি ব্যবসা করার কথা ভাবছেন, এই বিষয়টা জানা থাকলে আপনার
অনেক কাজে লাগবে। শুরুতে আসি মূল কথায়। একটা গাছের কোষে আসলে পুরো গাছ হয়ে ওঠার
সব তথ্যই লুকিয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা এই বৈশিষ্ট্যকেই কাজে লাগান।
গাছের সুস্থ একটা অংশ, হতে পারে পাতার কুঁড়ি বা কাণ্ডের ডগা, সেটাকে ল্যাবে
নিয়ে এসে বিশেষ পুষ্টি মাধ্যমে বসিয়ে দেওয়া হয়। ব্যস, এখান থেকেই শুরু হয়
আসল কাজ। প্রথম ধাপটা হলো মাদার প্ল্যান্ট বাছাই করা। এই ধাপে আপনাকে খুব সতর্ক
থাকতে হবে, কারণ যে গাছ থেকে নমুনা নেবেন সেটা যেন রোগমুক্ত আর ভালো ফলনের হয়।
একটা দুর্বল বা রোগাক্রান্ত গাছ থেকে নমুনা নিলে পুরো ব্যাচটাই নষ্ট হয়ে যাওয়ার
আশঙ্কা থাকে। তাই অভিজ্ঞ কৃষিবিদরা বলেন, মাদার প্ল্যান্ট বাছাইয়ে যত সময়
দেবেন, পরের ধাপগুলো তত সহজ হয়ে যাবে। এরপর আসে এক্সপ্ল্যান্ট সংগ্রহের পালা।
গাছের যে অংশটা কালচারের জন্য নেওয়া হয়, তাকেই বলে এক্সপ্ল্যান্ট। কাণ্ডের আগা,
পাতার সন্ধিস্থল, কখনো কখনো বীজও ব্যবহার করা হয়।
এই অংশটুকু কাটার সময় স্টেরাইল ব্লেড ব্যবহার করা লাগে, কারণ সামান্য
অসাবধানতাতেও জীবাণু ঢুকে সব নষ্ট করে দিতে পারে। সংগৃহীত এক্সপ্ল্যান্টকে এবার
জীবাণুমুক্ত করতে হয়। এই ধাপটাকে সারফেস স্টেরিলাইজেশন বলা হয়। সাধারণত
সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট বা অ্যালকোহলের হালকা দ্রবণে অল্প সময় ডুবিয়ে রাখা হয়
এক্সপ্ল্যান্টকে। এরপর বিশুদ্ধ পানি দিয়ে কয়েকবার ধুয়ে নেওয়া হয়, যাতে
রাসায়নিকের কোনো অবশিষ্টাংশ না থাকে। এবার আসল কাজ শুরু। ল্যামিনার এয়ার ফ্লো
ক্যাবিনেটের ভেতরে, একদম জীবাণুমুক্ত পরিবেশে এক্সপ্ল্যান্টকে কালচার মিডিয়ামে
বসিয়ে দেওয়া হয়। এই মিডিয়ামে থাকে আগার, চিনি, ভিটামিন আর হরমোনের এক নিখুঁত
মিশ্রণ।
মুরাশিগে অ্যান্ড স্কুগ মিডিয়াম, যাকে সংক্ষেপে এমএস মিডিয়াম বলা হয়, এটাই
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় এই কাজে। এই ধাপের নাম ইনিশিয়েশন স্টেজ। এখানে
এক্সপ্ল্যান্ট থেকে নতুন কোষ বিভাজন শুরু হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই দেখা যায়,
ছোট্ট একটা সবুজ কলি বা ক্যালাস তৈরি হচ্ছে। এই ক্যালাসই পরবর্তীতে পুরো গাছে
রূপান্তরিত হবে, তাই এই সময়টায় তাপমাত্রা আর আলোর পরিমাণ একদম ঠিকঠাক রাখতে
হয়। ইনিশিয়েশনের পর আসে মাল্টিপ্লিকেশন স্টেজ, আর এখানেই আসল ম্যাজিক ঘটে। একটা
এক্সপ্ল্যান্ট থেকে বারবার সাব-কালচার করে হাজার হাজার শুট তৈরি করা সম্ভব।
হরমোনের অনুপাত একটু এদিক ওদিক করলেই শুটের সংখ্যা বেড়ে যায়।
এই ধাপটা কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে, নির্ভর করে গাছের
প্রজাতির ওপর। তারপর আসে রুটিং স্টেজ। এতদিন যে ছোট ছোট শুট তৈরি হয়েছিল, এবার
সেগুলোতে শিকড় গজানোর সময়। মিডিয়ামের হরমোন অনুপাত বদলে দিয়ে অক্সিনের পরিমাণ
বাড়িয়ে দেওয়া হয়, কারণ অক্সিন হরমোনই শিকড় তৈরিতে মূল ভূমিকা রাখে। দুই থেকে
চার সপ্তাহের মধ্যেই শিকড়যুক্ত ছোট চারা প্রস্তুত হয়ে যায়। এখানেই কিন্তু কাজ
শেষ না। ল্যাবের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে সরাসরি মাটিতে চারা বসিয়ে দিলে
বেশিরভাগ চারাই মারা যায়। তাই হার্ডেনিং নামের একটা ধাপ পার করতে হয়। এই ধাপে
চারাগুলোকে ধীরে ধীরে বাইরের আবহাওয়ার সাথে অভ্যস্ত করা হয়, প্রথমে গ্রিনহাউজে,
তারপর ধাপে ধাপে খোলা পরিবেশে।
বাংলাদেশে এখন এই প্রযুক্তি নিয়ে বেশ কাজ হচ্ছে, আর সেটা আপনার জন্য ভালো খবর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন টিস্যু কালচার
ল্যাবরেটরি তৈরি হচ্ছে, যেখানে একটি ক্ষুদ্র উদ্ভিদ টিস্যু থেকেই হাজার হাজার
রোগমুক্ত চারা তৈরি হচ্ছে। বান্দরবানের মতো পাহাড়ি অঞ্চলেও এখন এই ল্যাব বসছে,
যাতে দুর্গম এলাকার কৃষকরাও মানসম্মত চারা পেতে পারেন। এই প্রবণতা বলে দেয়,
সামনের দিনগুলোতে এই প্রযুক্তি আরও সহজলভ্য হতে যাচ্ছে। কলা চাষের ক্ষেত্রে এই
পদ্ধতির সাফল্য বেশ চোখে পড়ার মতো। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক টিস্যু
কালচার পদ্ধতিতে উন্নত জাতের কলার চারা তৈরি করে দেখিয়েছেন, যা রোগ প্রতিরোধী আর
ফলনও ভালো।
এভাবেই একটা ছোট ল্যাব থেকে শুরু হওয়া গবেষণা পুরো একটা খাতের চেহারা বদলে দিতে
পারে। এবার আসি ব্যবহারিক কিছু কথায়। আপনি যদি নিজে ছোট পরিসরে টিস্যু কালচার
শুরু করতে চান, তাহলে প্রথমে একটা পরিষ্কার, ধুলাবালিমুক্ত ঘর দরকার হবে।
ল্যামিনার এয়ার ফ্লো ক্যাবিনেট, অটোক্লেভ, আর সঠিক তাপমাত্রার ইনকিউবেশন রুম, এই
তিনটা জিনিস ছাড়া কাজ শুরুই করা যাবে না। শুরুতে খরচ একটু বেশি মনে হলেও,
দীর্ঘমেয়াদে এটা লাভজনক একটা বিনিয়োগ। জীবাণুমুক্ততা রক্ষা করাটাই এই পদ্ধতির
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া একবার কালচারে ঢুকে গেলে পুরো
ব্যাচ নষ্ট হয়ে যায়, এমনকি মাসের পর মাসের পরিশ্রমও জলে যেতে পারে।
তাই প্রতিটা ধাপে গ্লাভস, মাস্ক, আর জীবাণুনাশক ব্যবহারে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে
না। অভিজ্ঞরা বলেন, সাফল্যের সিংহভাগই নির্ভর করে এই পরিচ্ছন্নতার ওপর। এই
পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ অভিন্ন গুণসম্পন্ন
চারা পাওয়া যায়। প্রথাগত পদ্ধতিতে যেখানে একটা গাছ থেকে হয়তো কয়েকটা মাত্র
চারা পাওয়া যায়, সেখানে টিস্যু কালচারে একই গাছ থেকে হাজার হাজার চারা তৈরি করা
সম্ভব। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, এই চারাগুলো রোগমুক্ত হয়, যা কৃষকের জন্য
দীর্ঘমেয়াদে অনেক বড় সুবিধা।
টিস্যু কালচার কী এবং কেন এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়
টিস্যু কালচার আসলে একটা অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কৌশল, যেখানে গাছের একটা ক্ষুদ্র অংশ
থেকে সম্পূর্ণ নতুন একটা চারা তৈরি করা হয়। ভাবুন তো, একটা পাতার সামান্য টুকরো
থেকেই জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার গাছ শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটাই বাস্তবতা।
বিজ্ঞানীরা গাছের কোষের এই বিশেষ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েই এই পদ্ধতি উদ্ভাবন
করেছেন। মূলত ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন নিয়ম মেনেই এই
পুরো প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এত ঝক্কি পোহানোর দরকারটাই বা কী? আপনি যদি প্রথাগত পদ্ধতিতে
চারা তৈরি করেন, তাহলে একটা গাছ থেকে খুব সীমিত সংখ্যক চারা পাবেন, আর রোগবালাই
ছড়ানোর ঝুঁকিও থেকে যায় পুরোটা সময়। টিস্যু কালচারে এই সমস্যাগুলো একদম নেই
বললেই চলে। জীবাণুমুক্ত পরিবেশে কাজ হয় বলে চারাগুলো হয় সুস্থ, সবল আর মাদার
প্ল্যান্টের মতোই অভিন্ন গুণসম্পন্ন।
আরেকটা বড় কারণ হলো সময়। বাজারে হঠাৎ কোনো জাতের চাহিদা বেড়ে গেলে, প্রথাগত
পদ্ধতিতে সেই চাহিদা মেটাতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। কিন্তু টিস্যু কালচার
দিয়ে অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণ চারা সরবরাহ করা সম্ভব হয়। এই কারণেই আজকাল কলা,
আলু, অর্কিডসহ অনেক ফসলেই এই পদ্ধতির ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।
টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে কোন কোন গাছের চারা উৎপাদন করা যায়
টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে আসলে প্রায় সব ধরনের গাছের চারাই তৈরি করা যায়, তবে
কিছু গাছে এই পদ্ধতির প্রয়োগ বেশি দেখা যায়। কলা এই তালিকার একদম প্রথম দিকে
থাকে, কারণ কলার প্রথাগত চারা তৈরিতে অনেক সময় লাগে আর রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও
বেশি। আপনি বাজারে এখন যত টিস্যু কালচার কলার চারা দেখেন, তার বেশিরভাগই এসেছে এই
একই পদ্ধতিতে। আলু আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ফসল, যেখানে টিস্যু কালচারের ব্যবহার
ব্যাপকভাবে হয়ে থাকে। বীজ-আলু উৎপাদনে ভাইরাসমুক্ত মাদার স্টক তৈরি করতে এই
পদ্ধতি এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া অর্কিডের মতো শৌখিন ফুলের চারা
তৈরিতেও এই কৌশলের জুড়ি নেই, কারণ অর্কিডের বীজ থেকে চারা তৈরি করা প্রকৃতিতে
এমনিতেই বেশ কঠিন।
স্ট্রবেরি, আনারস, আখ, বাঁশ, আর নানা রকম শোভাবর্ধনকারী গাছও এই তালিকায় যুক্ত
হয়েছে ধীরে ধীরে। বন উজাড় হয়ে যাওয়া কিছু দুর্লভ প্রজাতির গাছ সংরক্ষণেও
বিজ্ঞানীরা এখন টিস্যু কালচারের সাহায্য নিচ্ছেন। এমনকি ঔষধি গাছ, যেমন
অ্যালোভেরা বা তুলসীর মতো গাছের চারাও এখন এই পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে বড় পরিসরে।
মোটকথা, যে গাছে বীজ থেকে চারা তৈরি করা কঠিন কিংবা যে গাছের রোগমুক্ত ও অভিন্ন
গুণসম্পন্ন চারা দরকার, সেখানেই টিস্যু কালচারের ব্যবহার বেশি চোখে পড়ে। আপনার
আগ্রহ যদি কৃষি বা বাগান করা নিয়ে হয়, তাহলে এই তালিকা জানা থাকলে সঠিক গাছ
বেছে নেওয়াটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
টিস্যু কালচারের জন্য ল্যাবরেটরিতে কী কী সরঞ্জাম লাগে
টিস্যু কালচার ল্যাব বসাতে চাইলে প্রথমেই কিছু মৌলিক সরঞ্জাম জোগাড় করতে হবে
আপনাকে। ল্যামিনার এয়ার ফ্লো ক্যাবিনেট হলো সবচেয়ে জরুরি জিনিস, কারণ এখানেই
জীবাণুমুক্ত পরিবেশে কাজ করতে হয়। এরপর দরকার অটোক্লেভ, যেটা দিয়ে মিডিয়াম আর
যন্ত্রপাতি স্টেরিলাইজ করা হয়। তাপমাত্রা আর আলো নিয়ন্ত্রিত একটা কালচার রুম বা
ইনকিউবেটরও অপরিহার্য, কারণ চারার বৃদ্ধি এই পরিবেশের ওপরই নির্ভর করে। এছাড়া
পিএইচ মিটার, ওয়েট মেশিন, ডিস্টিল্ড ওয়াটার তৈরির যন্ত্র, আর কাচের কালচার বোতল
বা টিউব ছাড়াও কাজ চলবে না।
ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন নিয়ম মানতে গেলে এই
সরঞ্জামগুলো ছাড়া প্রথম পদক্ষেপই নেওয়া যাবে না। ছোট পরিসরে শুরু করলেও এই
মৌলিক জিনিসগুলোতে কোনো আপোষ করা ঠিক না, কারণ সরঞ্জামের মান খারাপ হলে পুরো
কালচারই নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদে এই কাজে থাকতে
চান, শুরুতেই ভালো মানের সরঞ্জামে বিনিয়োগ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
চারা উৎপাদনের ধাপগুলো সহজ ভাষায় জানুন
চারা উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াটা আসলে কয়েকটা ধাপে ভাগ করা যায়, আর ধাপগুলো
একবার বুঝে নিলে বিষয়টা আপনার কাছে আর জটিল মনে হবে না। প্রথমে একটা সুস্থ গাছ
থেকে ছোট্ট একটা অংশ নেওয়া হয়, একে বলে এক্সপ্ল্যান্ট। এরপর সেই অংশটাকে
ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত করে পুষ্টি সমৃদ্ধ মিডিয়ামে বসিয়ে দেওয়া হয়। কয়েকদিন
পরই দেখা যায়, সেখান থেকে ছোট্ট সবুজ কলি বের হচ্ছে। এরপর আসে বংশবিস্তারের
পালা, যেখানে একটা মাত্র কলি থেকে বারবার সাব-কালচার করে অসংখ্য শুট তৈরি করা
হয়।
এই শুটগুলো একটু বড় হলে এবার শিকড় গজানোর ব্যবস্থা করা হয়, মিডিয়ামে হরমোনের
মাত্রা বদলে দিয়ে। ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন নিয়ম মেনেই
এই পুরো ধাপগুলো একটার পর একটা সম্পন্ন করতে হয়, কোনোটা বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
শেষ ধাপে চারাগুলোকে ধীরে ধীরে বাইরের পরিবেশের সাথে অভ্যস্ত করে তোলা হয়, একে
বলে হার্ডেনিং। এই ধাপটা পার হলেই চারা মাটিতে রোপণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।
আপনি যদি প্রতিটা ধাপে ধৈর্য ধরে কাজ করেন, তাহলে একটা মাত্র গাছ থেকেই হাজার
হাজার সুস্থ চারা পাওয়া মোটেও কঠিন কিছু না।
টিস্যু কালচার পদ্ধতির প্রধান সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
টিস্যু কালচার পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, খুব অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ
রোগমুক্ত আর অভিন্ন গুণসম্পন্ন চারা পাওয়া যায়। প্রথাগত পদ্ধতিতে যেখানে একটা
গাছ থেকে হাতেগোনা কয়েকটা চারা পাওয়া যায়, সেখানে এই পদ্ধতিতে একই গাছ থেকে
হাজার হাজার চারা তৈরি করা সম্ভব হয়। ঋতু বা আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করতে হয় না
বলে সারা বছরই চারা উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া যায়, যা কৃষকের জন্য বিশাল একটা
সুবিধা। তবে এই পদ্ধতিতে কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে, যা আপনার জানা থাকা দরকার। ল্যাব
স্থাপনে প্রাথমিক খরচ বেশ বড়, আর দক্ষ জনবল ছাড়া কাজটা ঠিকভাবে চালানো কঠিন
হয়ে যায়।
এছাড়া জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি সবসময়ই থেকে যায়, একবার কালচার নষ্ট হলে সময় আর
অর্থ দুটোই জলে যায়। আরেকটা বিষয় হলো, টিস্যু কালচারে উৎপাদিত চারা মাটিতে
বসানোর পর হার্ডেনিং ধাপে অনেক সময় কিছু চারা টিকতে পারে না। জিনগত পরিবর্তনের
ঝুঁকিও একেবারে নেই তা বলা যায় না, যদিও এই হার সাধারণত খুব কম থাকে। তারপরও
সবমিলিয়ে বলা যায়, সুবিধার তুলনায় সীমাবদ্ধতাগুলো অনেকটাই ছোট, আর সঠিক
পরিচর্যায় এই ঝুঁকিগুলো বেশ ভালোভাবেই সামলে নেওয়া যায়।
ল্যাবরেটরিতে জীবাণুমুক্ত পরিবেশ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
টিস্যু কালচার ল্যাবে জীবাণুমুক্ত পরিবেশ রাখাটা আসলে পুরো কাজের প্রাণভোমরা বলা
যায়। একটা মাত্র ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার স্পোর যদি কালচার বোতলে ঢুকে যায়,
তাহলে সেখানে থাকা পুরো কালচারটাই কয়েকদিনের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। ভাবুন তো,
মাসের পর মাস ধরে যত্ন নিয়ে বড় করা একটা ব্যাচ, শুধু সামান্য অসাবধানতায়
পুরোটাই জলে গেল এই ঝুঁকিটাই টিস্যু কালচারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কালচার
মিডিয়ামে চিনি আর পুষ্টি উপাদান থাকে বলে জীবাণুর জন্য এটা একেবারে আদর্শ একটা
জায়গা বেড়ে ওঠার। তাই এক্সপ্ল্যান্ট বসানো থেকে শুরু করে প্রতিটা সাব-কালচারের
সময়, ল্যামিনার এয়ার ফ্লো ক্যাবিনেটের ভেতরে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজ করতে
হয় আপনাকে।
হাত, যন্ত্রপাতি, এমনকি বাতাস পর্যন্ত জীবাণুমুক্ত রাখা লাগে, না হলে সব পরিশ্রম
বৃথা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আরেকটা কারণ হলো, একবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে সেটা
শুধু একটা কালচারে সীমাবদ্ধ থাকে না, পাশের বোতলগুলোতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে
পারে। এজন্যই অভিজ্ঞ কৃষিবিদরা বারবার বলেন, টিস্যু কালচারে সাফল্যের সিংহভাগ
নির্ভর করে পরিচ্ছন্নতা আর জীবাণুমুক্ততার ওপর। এই একটা বিষয় ঠিকমতো মেনে চললেই
বাকি ধাপগুলো অনেকটা সহজ হয়ে যায়।
টিস্যু কালচারের চারা সংরক্ষণ ও রোপণ
ল্যাব থেকে শিকড়যুক্ত চারা বের হওয়ার পরই কিন্তু কাজ শেষ হয়ে যায় না, বরং
এখান থেকেই শুরু হয় সবচেয়ে স্পর্শকাতর একটা ধাপ। এতদিন চারাগুলো ল্যাবের
নিয়ন্ত্রিত, আর্দ্র পরিবেশে বড় হয়েছে, তাই সরাসরি মাটিতে বসিয়ে দিলে
বেশিরভাগই মারা যায়। ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন নিয়ম
মেনে চললে এই ধাপটাকে বলা হয় হার্ডেনিং, আর এটা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
হার্ডেনিংয়ের সময় চারাগুলোকে প্রথমে গ্রিনহাউজ বা শেডের নিচে হালকা ছায়াযুক্ত
জায়গায় রাখা হয়। ধীরে ধীরে কয়েক সপ্তাহ ধরে আর্দ্রতা কমিয়ে আনা হয় আর রোদের
সংস্পর্শ বাড়ানো হয় একটু একটু করে।
এভাবে চারা বাইরের আবহাওয়ার সাথে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, ফলে মাটিতে বসানোর পর টিকে
থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। চারা যখন যথেষ্ট শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে, তখনই কেবল
মাটিতে বা পলিব্যাগে রোপণ করা উচিত। সংরক্ষণের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হয় যেন
পর্যাপ্ত আলো, বাতাস চলাচল আর সঠিক পরিমাণ পানি পায় চারাগুলো। আপনি যদি এই ধাপে
একটু বাড়তি সময় আর যত্ন দেন, তাহলে আপনার পরিশ্রম করে তৈরি চারাগুলো মাঠে গিয়ে
সত্যিকারের ফসল দেবে।
বাংলাদেশে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির বর্তমান ব্যবহার ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশে টিস্যু কালচার প্রযুক্তি এখন আর গবেষণাগারের চার দেয়ালে বন্দি নেই,
ধীরে ধীরে এটা মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন টিস্যু কালচার ল্যাব গড়ে উঠছে, এমনকি
বান্দরবানের মতো পাহাড়ি এলাকাতেও এই সুবিধা পৌঁছে যাচ্ছে। ধনবাড়ীর মতো জায়গায়
কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক ল্যাব তৈরি হওয়াটাই বলে দেয়, সরকার এই খাতকে কতটা
গুরুত্ব দিচ্ছে। কলা, আলু, অর্কিডসহ বেশ কিছু ফসলে এই পদ্ধতির সাফল্য ইতিমধ্যেই
দৃশ্যমান হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে
উন্নত জাতের কলার চারা তৈরি করে দেখিয়েছেন, যা রপ্তানি বাজারের জন্যও
সম্ভাবনাময়।
এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় আর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা এখন সরাসরি কৃষকের কাছে
পৌঁছানোর পথ খুঁজে পাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত
হবে বলেই মনে হয়। আপনি যদি কৃষি খাতে নতুন কিছু করার কথা ভাবেন, তাহলে টিস্যু
কালচার হতে পারে একটা লাভজনক দিক, বিশেষ করে রোগমুক্ত আর মানসম্মত চারার চাহিদা
যেভাবে বাড়ছে তাতে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরা যত বেশি এই সুবিধার আওতায়
আসবেন, ফসলের মান আর উৎপাদনশীলতা ততই বাড়বে।
শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
টিস্যু কালচার নিয়ে এতক্ষণ যা যা বললাম, সবকিছুর সারমর্ম একটাই এটা কোনো কঠিন
বিজ্ঞান না, বরং ধৈর্য আর সতর্কতার একটা সুন্দর সমন্বয়। আপনি যদি কৃষি নিয়ে
সত্যিকারের আগ্রহী হন, এই প্রযুক্তি শেখাটা আপনার জন্য একটা বড় সুযোগ হয়ে
দাঁড়াতে পারে। শুরুতে হয়তো সব কিছু গোলমেলে লাগবে, কিছু ভুলও হবে কিন্তু
প্রতিটা ব্যর্থতাই আসলে পরের সাফল্যের পথ তৈরি করে দেয়।
আমাদের দেশের কৃষি এখন যেভাবে বদলে যাচ্ছে, তাতে টিস্যু কালচারের মতো প্রযুক্তি
একটা বড় ভূমিকা রাখবে সামনের দিনগুলোতে। রোগমুক্ত, মানসম্মত চারার চাহিদা যত
বাড়বে, এই পদ্ধতি জানা মানুষদের গুরুত্বও ততই বাড়বে। তাই দেরি না করে, ছোট
পরিসরে হলেও এই বিষয়ে জানাশোনা বাড়ানো শুরু করে দিন, ভবিষ্যতে এটাই আপনাকে
অনেকটা এগিয়ে রাখবে। 260416





অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url