OrdinaryITPostAd

বাসায় লাভবার্ড বা বাজরিগার পাখি পালনের সহজ পদ্ধতি

বাসায় লাভবার্ড বা বাজরিগার পাখি পালনের সহজ পদ্ধতি জানতে চাইলে এই গাইডটি আপনার জন্য। নতুন পাখিপ্রেমীরা প্রায়ই খাবার, খাঁচা আর যত্ন নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। এখানে সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে সব প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বাসায়-লাভবার্ড-বা-বাজরিগার-পাখি-পালনের-সহজ-পদ্ধতি
কম খরচে কীভাবে ঘরেই সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান পাখি পালন করবেন, সেটাও বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। ছোট কিছু যত্নই আপনার পাখিকে রাখতে পারে চঞ্চল, সুখী আর প্রাণবন্ত। পাখিপ্রেমীদের জন্য এই আর্টিকেল হতে পারে সবচেয়ে দরকারি ও কাজের একটি সম্পূর্ণ সহায়িকা।

পেজ সুচিপত্রঃ বাসায় লাভবার্ড বা বাজরিগার পাখি পালনের সহজ পদ্ধতি

বাসায় লাভবার্ড বা বাজরিগার পাখি পালনের সহজ পদ্ধতি

বাসায় লাভবার্ড বা বাজরিগার পাখি পালনের সহজ পদ্ধতি জেনে নিলে, আর সঠিকভাবে যত্ন নিলে এরা সহজেই ঘরের পরিবেশে মানিয়ে নেয়। আমি বিভিন্ন অভিজ্ঞ পাখি পালকদের কথা আর সাধারণ নিয়ম থেকে যা দেখেছি, সেগুলো সহজ করে লিখছি। লাভবার্ড আর বাজরিগার দুটোই ছোট তোতা জাতীয়, কিন্তু লাভবার্ড একটু বেশি চঞ্চল আর জোড়ায় থাকতে পছন্দ করে, বাজরিগার তুলনামূলক শান্ত আর পোষ মানানো সহজ। শুরুতে ছোট করে শুরু করলে ভালো হয়, পরে অভিজ্ঞতা হলে বাড়াতে পারবেন।

  • পাখি কেনার সময় সাবধানতাঃ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুস্থ আর সক্রিয় পাখি কেনা। বাজার বা পেট শপে গিয়ে দেখুন চোখ উজ্জ্বল, পালক ঝকঝকে আর পাখিটা স্বাভাবিকভাবে ঘুরছে-ফিরছে। অলস বা পালক ফোলা পাখি একদম এড়িয়ে চলুন, কারণ পরে সমস্যায় পড়তে পারেন। লাভবার্ডের ক্ষেত্রে নর-মাদি জোড়া দেখে কিনলে ভালো, বয়স ৩-৪ মাসের হলে সহজে মানিয়ে নেয়। বাজরিগারও একই বয়সের নিন, তবে একা রাখলে আপনার সাথে পোষ মানাতে সুবিধা হয়। প্রথমবার ২ জোড়া নিয়ে শুরু করলে ব্রিডিং-এ সুবিধা, কিন্তু স্পেস আর সময় যাচাই করে নিন।
  • খাঁচা নির্বাচন ও সেটআপঃ খাঁচা বড় আর আরামদায়ক হওয়া চাই। লাভবার্ডের জন্য এক জোড়ার কমপক্ষে ২৪x২৪x১৮ ইঞ্চি বা তার চেয়ে বড়, অনুভূমিক বারযুক্ত যাতে উঠতে-নামতে সুবিধা হয়। বাজরিগারের জন্য ১৮x১৮x২৪ ইঞ্চি মিনিমাম, কিন্তু যত বড় পারেন তত ভালো। খাঁচা ঘরের নিরিবিলি কোণে রাখুন যেখানে সরাসরি রোদ বা ঠান্ডা হাওয়া না লাগে। ভেতরে বিভিন্ন মোটা-পাতলা পার্চ, খেলনা আর খাবার-পানির পাত্র রাখুন। ব্রিডিং করতে চাইলে আলাদা নেস্ট বক্স বা মাটির হাঁড়ি দিন ৮x৮x৮ সাইজের। প্লাস্টিকের দড়ি বা সুতা আশেপাশে রাখবেন না, কারণ এরা কামড়ে খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
  • খাবারের তালিকা ও রুটিনঃ এদের মূল খাবার সিড মিক্স-কাউন, চিনা, বাজরা, তিসি, সূর্যমুখী বিচি ইত্যাদি। লাভবার্ড একটা পাখি দিনে ৪০-৬০ গ্রাম খায়, বাজরিগারও প্রায় একই। প্রতিদিন ফ্রেশ ফল (আপেল, কলা, পেয়ারা, বেদানা), সবজি (পালং, কলমি, গাজর, ব্রকোলি) আর কচি ঘাসের পাতা দিন। সপ্তাহে কয়েকদিন ডিম সিদ্ধ বা এগ ফুড দিলে প্রোটিন মেলে। পেলেট ফুড পেলে ভালো, কিন্তু আমাদের দেশে সিড মিক্সই চলে। খাবার রুটিন করে দিন-সকালে আর সন্ধ্যায় দিন, রাতে পাত্র সরিয়ে রাখুন যাতে নোংরা না হয়। অ্যাভোকাডো, চকলেট, পেঁয়াজ বা লবণাক্ত কিছু একদম দিবেন না, মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
  • পানি ও গোসলের ব্যবস্থাঃ এরা প্রচুর পানি খায় আর গোসল করতে ভালোবাসে। প্রতিদিন ২-৩ বার পানি বদলান, সবসময় ফ্রেশ আর পরিষ্কার রাখুন। একটা ছোট ডিশে পানি দিয়ে গোসলের সুযোগ করে দিন। লাভবার্ড বিশেষ করে মিস্ট স্প্রে পছন্দ করে, তাই স্প্রে বোতল দিয়ে হালকা করে ছিটিয়ে দিতে পারেন। বাজরিগারও একইভাবে গোসল করে সুস্থ থাকে।
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রাখাঃ খাঁচা প্রতিদিন একটু একটু সাফ করুন। পায়খানা ২ দিন অন্তর ভালো করে পরিষ্কার করুন, জীবাণুনাশক স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন (পাখির কাছে না লাগিয়ে)। খাবার-পানির পাত্র গরম পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে রাখুন। এতে রোগের ঝুঁকি অনেক কমে। নোংরা খাঁচা রাখলে পাখি অসুস্থ হয়ে পড়ে খুব তাড়াতাড়ি।
  • খেলনা ও বিনোদনঃ এরা বুদ্ধিমান, তাই খেলনা দিন-চিবানোর জিনিস, সুইং, ছোট মিরর (অতিরিক্ত না হলে ভালো) আর ফরেজিং টয় যাতে খাবার খুঁজে খেতে হয়। লাভবার্ড জোড়ায় থাকলে একে অপরের সাথে খেলে, বাজরিগারও ফ্লক পছন্দ করে। দিনে কিছুক্ষণ ঘরে ছেড়ে উড়তে দিতে পারেন, তবে ঘর সেফ করে নিন-জানালা বন্ধ, তার-ফ্যান সাবধান।
  • পরিবেশ ও তাপমাত্রাঃ ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ১৮-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস আদর্শ। অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা থেকে বাঁচান। এসি বা ফ্যানের নিচে সরাসরি না রাখাই ভালো। শান্ত জায়গায় রাখুন, হঠাৎ জোরে শব্দ হলে ভয় পায়। লাভবার্ড একটু বেশি জোরে চিৎকার করে, তাই অ্যাপার্টমেন্টে থাকলে এটা মাথায় রাখুন।
  • স্বাস্থ্য যত্ন ও পর্যবেক্ষণঃ প্রতিদিন পাখি দেখুন-খাওয়া-দাওয়া ঠিক আছে কিনা, পালক ঝরছে কি না, মলত্যাগ স্বাভাবিক কিনা। কোনো সমস্যা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে পাখি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখান। নিয়মিত কৃমির ওষুধ আর ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট চিকিৎসকের পরামর্শে দিন। বছরে একবার চেকআপ করালে ভালো।
  • ব্রিডিং করতে চাইলেঃ ১০-১২ মাস বয়স হলে শুরু করতে পারেন। প্রাইভেসি দিন, নেস্ট বক্স রাখুন। ডিম ৫-৮টা হতে পারে, ২২-২৫ দিনে বাচ্চা বের হয়। মা পাখি একাই তা দেয়। অতিরিক্ত ব্রিডিং না করানো ভালো, পাখির শরীর খারাপ হয়।
  • সাধারণ ভুল এড়ানোঃ প্লাস্টিক খাওয়ানো, অপর্যাপ্ত পানি, নোংরা খাঁচা, একা রেখে অবহেলা-এগুলো এড়িয়ে চলুন। ধৈর্য ধরে পোষ মানান, হঠাৎ হাত দিয়ে ভয় দেখাবেন না। লাভবার্ড একা রাখলে আগ্রাসী হতে পারে, তাই জোড়ায় রাখাই ভালো।

পাখির জন্য সঠিক খাঁচা নির্বাচন ও সেটআপ

খাঁচাটা আসলে আপনার পাখির পুরো দুনিয়া। এটা যদি ছোট বা অসুবিধাজনক হয়, তাহলে পাখি সারাদিন অস্থির হয়ে থাকবে, পালক ছিঁড়তে শুরু করবে, খাওয়া কমিয়ে দেবে আর অনেক সময় স্বাস্থ্যও খারাপ হয়ে যায়। আমি নিজে যখন প্রথম বাজরিগার কিনেছিলাম, তখন সুন্দর দেখতে একটা ছোট খাঁচা নিয়ে ফেলেছিলাম। ভেবেছিলাম যথেষ্ট হবে। কিন্তু দুই-তিন দিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম ভুল হয়েছে। পাখিটা সারাক্ষণ বার ধরে উঠানামা করত, চিৎকার করত আর একদম শান্ত থাকত না। পরে বড় খাঁচায় নিয়ে আসার পর দেখলাম একদম বদলে গেছে। তাই বলছি, খাঁচা কেনার আগে সাইজটা একদম ঠিকঠাক বেছে নিন।

বাজরিগারের জন্য সবচেয়ে ছোট যেটা চলবে সেটা হলো ১৮ ইঞ্চি লম্বা × ১৮ ইঞ্চি চওড়া × ১৮ ইঞ্চি উঁচু। কিন্তু যত বড় দিতে পারবেন তত ভালো। লাভবার্ড একটু বেশি সক্রিয় আর জোড়ায় থাকতে পছন্দ করে, তাই তাদের জন্য ২৪ ইঞ্চি বা তার চেয়ে বড় খাঁচাই আদর্শ। বারগুলো অবশ্যই হরাইজন্টাল হওয়া উচিত, কারণ এতে পাখি সহজে উপর-নিচে উঠতে পারে আর ব্যায়ামও হয়। ভার্টিকাল বারের খাঁচায় অনেক সময় পায়ে সমস্যা হয়। বারের ফাঁক যেন খুব বেশি না হয়, নয়তো মাথা আটকে যেতে পারে। আমি সাধারণত স্টেইনলেস স্টিল বা ভালো পাউডার কোটেড খাঁচা নিই। এগুলো মরিচা ধরে না, পরিষ্কার করা সহজ আর বেশি দিন টেকে।
খাঁচা রাখার জায়গাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের একটা শান্ত কোণ বেছে নিন যেখানে প্রাকৃতিক আলো আসে কিন্তু সরাসরি রোদ পড়ে না বা ঠান্ডা হাওয়া সরাসরি লাগে না। জানালার কাছে রাখতে পারেন, তবে ড্রাফট যেন না হয়। একদম রান্নাঘরের কাছে রাখবেন না-রান্নার ধোঁয়া, তেলের গন্ধ আর তাপমাত্রার ওঠানামা এই পাখিদের জন্য খুব ক্ষতিকর। আমি খাঁচার নিচে সাধারণত খবরের কাগজ বা স্যান্ড পেপার বিছিয়ে রাখি। পায়খানা পড়লে পরিষ্কার করতে খুব সুবিধা হয়, আর প্রতি দুই-তিন দিন অন্তর কাগজ বদলে দিলেই চলে।

সেটআপের সময় আরও কয়েকটা ছোট জিনিস খেয়াল রাখলে পাখি অনেক বেশি আরাম পায়। দুই-তিনটা ভিন্ন উচ্চতার কাঠের পার্চ রাখুন যাতে পায়ের মাসল সুস্থ থাকে। খেলনা এমনভাবে ঝুলিয়ে দিন যাতে খাবারের পাত্রে না লাগে। খাঁচার দরজাটা ভালো করে চেক করুন-সহজে খুলবে কিন্তু পাখি নিজে খুলতে না পারে। এভাবে ঠিকমতো খাঁচা বেছে নিলে আর সেটআপ করলে আপনার পাখি সত্যিই সুখী থাকবে আর আপনারও দেখতে ভালো লাগবে।

লাভবার্ড বা বাজরিগারের খাবার তালিকা ও খাওয়ানোর নিয়ম

খাবার হলো পাখির স্বাস্থ্যের মূল চাবি। বাসায় লাভবার্ড বা বাজরিগার পাখি পালনের সহজ পদ্ধতি আসলে সঠিক খাবার আর খাওয়ানোর রুটিনের উপরেই বেশি নির্ভর করে। আমি নিজে যখন প্রথমবার এদের পালন শুরু করি তখন খাবার নিয়ে খুব একটা গুরুত্ব দেইনি, শুধু দোকান থেকে যা পেয়েছি তাই দিয়ে দিতাম। কিন্তু কয়েক মাস পর দেখলাম পাখিগুলোর পালক নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে আর ওজনও কমছে। তখন থেকে আমি খাবারের তালিকা পুরোপুরি বদলে দিয়েছি আর এখন ওরা একদম চকচকে আর সক্রিয় থাকে। দৈনিক খাবারের প্রায় সত্তর শতাংশ হওয়া উচিত ভালো মানের সীড মিক্স। এতে কাউন, চিনা, বাজরা, সূর্যমুখী আর তিসি মেশানো থাকলে সবচেয়ে ভালো হয়। 

আমি সাধারণত প্যাকেটজাত মিক্স কিনি যাতে ধুলোবালি কম থাকে। বাকি তিরিশ শতাংশ জায়গায় রাখি তাজা সবজি আর ফল। পালং শাক, গাজরের টুকরো, আপেল, নাশপাতি আর কলা ওদের খুব প্রিয়। প্রতিদিন সকালে খাবার আর পানির পাত্র ধুয়ে নতুন করে দেই। পানি যেন সবসময় পরিষ্কার থাকে, কারণ এরা খুব সহজে পেটের সমস্যায় ভোগে। শীতকালে আমি সপ্তাহে একদিন সেদ্ধ ডিম বা এগ ফুড দেই, এতে প্রোটিন বাড়ে আর পাখিরা বেশি এনার্জি পায়। 

পেলেট ফুডও চেষ্টা করে দেখতে পারেন, যদি পাখি খায় তাহলে পুষ্টির ভারসাম্য অনেক ভালো হয়। কিন্তু কখনো চকলেট, অ্যাভোকাডো, লবণাক্ত খাবার বা প্রসেসড ফুড দেবেন না-এগুলো ওদের জন্য খুব বিপজ্জনক। হাত থেকে খাওয়ালে ওরা আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে খায় আর আপনার সাথে বন্ধুত্বও গভীর হয়। এভাবে খাবারের ব্যবস্থা করলে আপনার পাখি দীর্ঘদিন সুস্থ আর খুশি থাকবে।

খাঁচা পরিষ্কার রাখা এবং দৈনন্দিন যত্ন

খাঁচা পরিষ্কার না রাখলে পাখি খুব তাড়াতাড়ি অসুস্থ হয়ে যায়, তাই এটা আমার রুটিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন সকালে উঠেই প্রথম কাজ হলো পানির পাত্র আর খাবারের বাটি ধুয়ে নতুন করে ভরে দেওয়া, কারণ পুরোনো পানি বা খাবারে ব্যাকটেরিয়া জন্মায় খুব সহজে। নিচের ট্রেটা দুই-তিন দিন অন্তর পরিষ্কার করি, খবরের কাগজ বা স্যান্ড পেপার বদলে দিই যাতে গন্ধ না হয় আর পায়খানা জমে না থাকে। সপ্তাহে একদিন পুরো খাঁচাটা হালকা সাবান পানিতে ভালো করে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে নিই, এতে পাখির পালক চকচকে থাকে আর বাড়ির ভিতরে কোনো অপ্রীতিকর গন্ধও ছড়ায় না। আমার নিজের রুটিনে সকালে মোটে দশ-বারো মিনিট লাগে পুরোটা সাজাতে, আর গরমকালে ফ্যান চালিয়ে রাখি কিন্তু সরাসরি বাতাস যেন পাখির উপর না পড়ে। এভাবে নিয়মিত যত্ন নিলে পাখি সুস্থ থাকে, আপনারও মন ভালো থাকে।

পাখিকে হাতে অভ্যস্ত করা বা পোষ মানানোর সহজ উপায়

পাখিকে হাতে অভ্যস্ত করার কাজটা আসলে ধৈর্যের খেলা, কোনো জাদু নয়। প্রথম কয়েকদিন খাঁচার বাইরে থেকে শুধু নাম ধরে নরম স্বরে কথা বলুন, যাতে পাখি আপনার গলার আওয়াজ চিনে ফেলে আর ভয় কমে। জোর করে ধরার চেষ্টা একদম করবেন না, কারণ একবার ভয় পেলে আবার বিশ্বাস ফিরতে অনেক সময় লাগে। প্রথমে হাতে মিলেট স্প্রে নিয়ে খাঁচার সামনে চুপচাপ বসে থাকুন। বাসায় লাভবার্ড বা বাজরিগার পাখি পালনের সহজ পদ্ধতি এখানে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করাটাই আসল কাজ। ওরা নিজে নিজে এসে খাবার নিতে শুরু করলে বুঝবেন সম্পর্ক গড়ে উঠছে।
বাসায়-লাভবার্ড-বা-বাজরিগার-পাখি-পালনের-সহজ-পদ্ধতি
তারপর ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিন, কাঁধে বা আঙুলে বসতে দিন। আমার বাজরিগারটা মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে কাঁধে উঠে বসতে শুরু করেছিল, আর লাভবার্ডটা একটু বেশি সময় নিয়েছিল কিন্তু একবার পোষ মানলে খুব আদুরে হয়ে যায়। প্রতিদিন মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিট সময় দিলেই যথেষ্ট, এভাবে করলে পাখি আপনার সত্যিকারের ছোট্ট বন্ধু হয়ে যাবে।

পাখির স্বাস্থ্য যত্ন এবং সাধারণ সমস্যার সমাধান

পাখি অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে যে লক্ষণগুলো চোখে পড়ে সেগুলো হলো পালক ফুলিয়ে চুপচাপ বসে থাকা, খাওয়া একদম কমে যাওয়া, পায়খানা পাতলা বা অস্বাভাবিক রঙের হয়ে যাওয়া। আমি নিজে যখন প্রথমবার এমন দেখেছিলাম তখন খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু শিখে গেছি যে তাড়াতাড়ি উষ্ণ জায়গায় রেখে ভেটের কাছে নিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো। প্রতিরোধই আসল চাবি-প্রতিদিন খাঁচা পরিষ্কার রাখা, পানি আর খাবারের পাত্র ধুয়ে নতুন করে দেওয়া আর ঘরের তাপমাত্রা স্থির রাখা। এভাবে ছোটখাটো সমস্যাগুলো অনেক আগেই ধরা পড়ে আর বড় অসুস্থতা এড়ানো যায়। 
বাসায় লাভবার্ড বা বাজরিগার পাখি পালনের সহজ পদ্ধতি এখানে নিয়মিত যত্নের মধ্যে প্রতি মাসে একবার পাখির ওজন চেক করাটা আমার রুটিনে রেখেছি। ঠান্ডা লাগলে হালকা গরম পানিতে ইলেকট্রোলাইট মিশিয়ে দেই, যাতে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। মনে রাখবেন, এই পাখিরা মানুষের কাছ থেকেও রোগ নিতে পারে, তাই আপনি যদি সর্দি-কাশিতে ভোগেন তাহলে খুব কাছে যাবেন না। এভাবে সচেতন থাকলে আপনার পাখি বছরের পর বছর সুস্থ আর প্রাণবন্ত থাকবে।

খেলনা, পার্চ ও বিনোদনের ব্যবস্থা

লাভবার্ড আর বাজরিগার খুব চঞ্চল আর বুদ্ধিমান পাখি, তাই খেলনা আর বিনোদনের ব্যবস্থা না করলে ওরা একঘেয়েমিতে ভুগে পালক ছিঁড়তে শুরু করে। আমি খাঁচায় সবসময় বিভিন্ন ধরনের খেলনা রাখি-প্রাকৃতিক কাঠের ডাল, রঙিন দড়ি, ছোট ঘণ্টা আর আয়না-যাতে ওরা সময় কাটাতে পারে আর মজা পায়। প্রতি সপ্তাহে খেলনাগুলো বদলে দেই যাতে ওদের আগ্রহ নতুন করে জাগে। এছাড়া বিভিন্ন উচ্চতার কয়েকটা পার্চ রাখি যাতে পায়ের ব্যায়াম হয় এবং পা সুস্থ থাকে। সবচেয়ে ভালো হয় প্রতিদিন কিছুক্ষণ খাঁচার বাইরে ঘরের ভিতর নিরাপদে উড়তে দেওয়া। এতে ওরা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকে এবং অনেক বেশি খুশি দেখায়।

ব্রিডিং বা বাচ্চা উৎপাদন করাতে চাইলে কী করবেন

যদি আপনার লাভবার্ড বা বাজরিগারের বাচ্চা উৎপাদন করানোর ইচ্ছা থাকে, তাহলে শুরুতেই মনে রাখবেন যে এটা সাধারণ পালনের চেয়ে একটু বেশি যত্ন ও ধৈর্যের ব্যাপার। বাসায় লাভবার্ড বা বাজরিগার পাখি পালনের সহজ পদ্ধতি এখানে আরও সতর্কতার সাথে অনুসরণ করতে হয় কারণ ব্রিডিংয়ের সময় পাখিরা অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে যায়। লাভবার্ড সাধারণত বেশ সহজেই বাচ্চা দেয়, আর বাজরিগারও ভালো পরিবেশ পেলে ভালো ফল দেয়। এজন্য প্রথমেই একটা সঠিক জোড়া পাখি রাখুন, তারপর খাঁচায় একটা নেস্ট বক্স বা বাসা বাক্স লাগিয়ে দিন যাতে ওরা নিরাপদে ডিম পাড়তে পারে।
বাসায়-লাভবার্ড-বা-বাজরিগার-পাখি-পালনের-সহজ-পদ্ধতি
এছাড়া খাবারে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বাড়িয়ে দিন-সেদ্ধ ডিম, কাটলবোন বা ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট দিলে মা পাখির শরীর ভালো থাকে আর ডিমের খোসাও মজবুত হয়। খাঁচাটা একদম শান্ত, নিরিবিলি জায়গায় রাখুন যাতে কোনো ঝামেলা বা হঠাৎ শব্দ না হয়, কারণ এতে পাখিরা ভয় পেয়ে ডিম ফেলে দিতে পারে। আমি প্রথমবার খুব ব্যস্ত জায়গায় রেখেছিলাম বলে কোনো ফল হয়নি, পরে শান্ত কোণে সরিয়ে নিয়ে দেখলাম দ্রুত ব্রিডিং শুরু হয়ে গেল। বাচ্চা বের হওয়ার পরও মা-বাবাকে আলাদা করে বেশি পুষ্টিকর খাবার দিতে হয় যাতে বাচ্চাগুলো সুস্থভাবে বড় হয়, এভাবে সঠিকভাবে করলে বাচ্চা পাওয়া মোটামুটি সহজ হয়।

পাখি কেনার আগে যা যা খেয়াল রাখবেন

পাখি কেনার আগে সবচেয়ে বড় কাজ হলো ভালো করে দেখে শুনে নেওয়া, কারণ একবার নিয়ে এলে এটা আর ফেরত দেওয়া যায় না। বাজার বা পেট শপ থেকে কিনতে গেলে সবসময় এমন পাখি বেছে নিন যার চোখ দুটো উজ্জ্বল, পালক পরিষ্কার আর চকচকে, শরীর সক্রিয় এবং কোনো ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ নেই। আমি নিজে প্রথমবার দোকানদারের কথায় ভুলে একটা একটু নিস্তেজ পাখি নিয়ে এসেছিলাম, পরে অনেক কষ্ট করে সুস্থ করতে হয়েছে। তাই দোকানদারের মিষ্টি কথায় একদম ভুলবেন না, নিজের চোখে ভালো করে দেখুন আর যদি সম্ভব হয় তাহলে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে দেখুন পাখিটা কেমন চলাফেরা করছে।
প্রথমবার একটা পাখি দিয়েই শুরু করুন, পরে যখন অভ্যস্ত হয়ে যাবেন তখন আরেকটা নেবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজেটের হিসাব রাখা-শুধু কেনার দাম নয়, পরের দিনগুলোতে খাবার, খেলনা, ভেটের খরচ আর দীর্ঘমেয়াদি যত্নের কথা মাথায় রাখুন। মনে রাখবেন, এটা কোনো খেলনা নয়, এটা ১০ থেকে ১৫ বছরের একটা দায়িত্ব। সবকিছু ঠিকঠাক করে নিলে তবেই পাখি নিয়ে আসুন, তাহলে পরে আর আফসোস করতে হবে না।

শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য

এই পুরো লেখাটা লিখতে গিয়ে বারবার মনে পড়ছে যে পাখি পালন আসলে কোনো শখের জিনিস নয়, এটা একটা ছোট্ট প্রাণের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপার। আমি চার বছর ধরে লাভবার্ড আর বাজরিগার পালন করছি, আর প্রতিদিনই নতুন করে বুঝতে পারি কতটা আনন্দ দেয় এরা। যদি আপনি সঠিক খাঁচা, খাবার আর একটু ধৈর্য নিয়ে শুরু করেন, তাহলে দেখবেন ওরা আপনার ঘরেরই একজন হয়ে উঠেছে। কোনো অভিজ্ঞতা থাকলে কমেন্টে জানাবেন, আমরা সবাই মিলে আরও ভালো করে শিখতে পারব। পাখি পালন মানে শুধু যত্ন নয়, একটা সুন্দর বন্ধুত্বের শুরু। শুরু করে দেখুন, একবার শুরু করলে আর ছাড়তে ইচ্ছা করবে না। 260416

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url